"পাঠক,পাঠিকাদের মতামত বা মন্তব্যই তো লেখকদের লেখিকাদের পুনরায় লিখিবার একমাত্র প্রেরণা। তাই দয়া করিয়া মতামত দিতে ভুলিবেন না, তা সে যেমনই হউক না কেন ।" http://tobey-shono.blogspot.com
Showing posts with label কৌতুক প্রবন্ধ. Show all posts
Showing posts with label কৌতুক প্রবন্ধ. Show all posts

Tuesday, April 9, 2013

বিদায়ী বসন্তের প্রেম

জীবনকিশোর আজকাল তার নিজের কাজ লইয়াই ব্যস্ত থাকে। যৌবনানন্দের দিকে নজর দেওয়ার বিশেষ সুবিধা আর নাই। যৌবনানন্দের বয়সও অনেক হইয়াছে। অনেক কাল হইলো সে একই ভাবে জীবন কাটাইতেছে। বসন্তের দেখা বহুকাল সে পায় নাই। আর ভালো লাগিতেছে না। এবার দিগম্বর হইয়া বাণপ্রস্থে যাইবার সময় বুঝি হইয়াছে। একদিন সে জীবনকিশোরকে ইহা কহিয়াই ফেলিল।  
যৌবনানন্দের এমন ভাবগতিক দেখিয়া জীবনকিশোরের হৃদয় উত্তাল, উদ্বেল হইয়া উঠিল। কহিল, 'যাস নে বাপ! তুই গেলে আমার আর কি থাকিবে রে? আর কয়টা বৎসর সবুর করিয়া যা। তোকে আমি রোজ চিতল মাছের পেটি, কচি লাউএর ঘণ্ট,  বিলিতি আমড়ার অম্বল, নেয়াপাতি ডাবের শাঁস ও তার জল খাওয়াইব।"

কিন্তু যৌবনানন্দ কোনও কথাই শুনিতে চাহে না। সে কহিল, 'কাঁচা-লঙ্কা, কালোজিরা দিয়া জ্যান্ত খুকি ইলিশের ঝোল খাওয়াইতে পারো রোজ? খোকা হইলে চলিবে না।" ইহা জীবনকিশোরের পক্ষে সম্ভব নহে। ইলিশ চাই জ্যান্ত, তার মধ্য হইতে আবার খুকি। খানিক ভাবিয়া সে উত্তর করিল, তুই কুমড়ার ছক্কা খাইবি? বড় উৎকৃষ্ট খাইতে। অথবা কাঁচকলার ডালনা? কচি-বেলায় তোকে অনেক খাওয়াইয়াছিলাম না?" যৌবনানন্দ কোনও কথা কহিল না। গুম হইয়া বসিয়া রহিল।

"তুই তো এমন অবাধ্য ছিলি না। তোর এমন মতি হইলো কেন?", কহিল জীবনকিশোর।

যৌবনানন্দ খানিক নালিশ জানাইবার সুরে কহিল, "কেন, সেদিন পুকুর ঘাটে দুই দণ্ড দাঁড়াইতে কি হইয়াছিল? কেদার চাটুজ্জের কচি ডাগর-ডুগুর বউটি কেমন ডুম্বুর গাছের ডালে বসিয়া পা দিয়া জলে ছলাৎ, ছলাৎ শব্দ করিতেছিল শাড়ি কাপড়ের দিকে কোনও ভ্রূক্ষেপই ছিল না। একটি পা নামিতেছে, তো অন্য পা উঠিতেছে, সেটি নামিতেছে তো অন্যটি উঠিতেছে। নিশ্চয় নাইতে আসিয়াছিল। আচ্ছা, আমাকে কি এতটুকুও বিশ্বাস করিতে পারো না? তেমন কিছু অঘটন বাধাইতাম না, ইহা নিশ্চিত বলিতে পারি।"

উত্তরে জীবনকিশোর কহিল, "বাপ, এক্ষণে কি আর আমার সেই বয়স আছে? লোকে দেখিলে কি কহিবে? আর রসকে তো দিন, দিন যেদিক, সেদিক দিয়া বাড়িয়া  চলিতে দেওয়া যায় না। বুঝিয়া কাজ করিতে হয়। দিনকাল ভালো নয়।" 

"তবে তুমি তোমার বয়সের ভার, ধুতির কোঁচা আর বুড়া দন্ত সামলাও। আমি চলিলাম। এমন নুইয়া পরা মানুষের সহিত আমার বনিবে না", কহিল যৌবনানন্দ।

"কেন রে, তোকে সেদিন বৈকালে হাটের পথে নেত্যকালির সঙ্গে আলাপ করাইয়া দিলাম না? কি সুন্দর কথা কয় নেত্যকালি। চোখে মুখ হইতে যেন রূপ-লাবণ্য ঝরিয়া, ঝরিয়া পরিতেছিল। ঠিক যেন পাকা নেংরা আমটি।" জোর গলায় কহিল জীবনকিশোর।

"তোমার ভীমরতি হইয়াছে, জীবনকিশোর, তোমার ভীমরতি হইয়াছে। ওই নেত্যকালিকে দেখিবামাত্রই তো মনে হইলো কোনও কয়লার খনিতে উহার জন্ম। আর অঙ্গের এখান ওখান হইতে যেন ন্যাকড়ার পুঁটুলি ঝুলিতেছে। চেহারার কোনও ছিরিছাঁদ আছে? তায় আবার কহিল পাঁচ সন্তানের জননী। তোমার অধীনে থাকিলে গলায় তেঁতুল বীচি আটকাইয়া আমি মরিব, ইহাতে কোনও সন্দেহ নাই। এক্ষণে দিন পালটাইয়া  গিয়াছে। কচি, কচি কাঁঠালচাঁপার দল খোলামেলা শরীর-মন লইয়া নলেন গুড়ের পিঠা-পায়াস সাজিয়া যত্রতত্র ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। আমার মন আর শান্ত থাকিতেছে না। আমি  পিঠা-পায়াস, পরমান্ন খাইতে চাহি। তোমাকে অবলম্বন করিয়া আর দিন চলে না।", কহে যৌবনানন্দ।

জীবনকিশোর মনে বল সঞ্চয় করিয়া কহিল, "বুঝিলাম, তোর কথা। তবে কিনা এক্ষণে নলেন গুঁড়ে আর আগের মত মিষ্টও নাই, সুবাসও নাই। আর ওই সব পিঠা-পায়াস যা দেখিতেছিস, তা সকলই লবণাক্ত। তোকে বরং আম, কলা আনিয়া খাওয়াইব, অথবা কচি বেলের মোরব্বা। তুই কেমন কলা খাইতে ভালবাসিতি।"
"তোমার ওসব কথায় আর ভুলিতেছি না। কিছুদিন আগে একবার জালের পোশাক পরা টিকিট লাগানো রাঙা, রসালো আপেল খাইতে চাহিয়াছিলাম তোমার কাছে। তুমি কহিয়াছিলে উহা টক। বেবাক মিথ্যা কথা। ঘ্রাণেই বুঝিয়াছিলাম উহা অতীব মিষ্ট। পরে জানিয়াছি উহা বিদিশীও বটে। আমার পাওনা গণ্ডা মিটাইয়া দাও। আমি বিদায় লই।", কহে যৌবনানন্দ। 
"ঠিক আছে। তুই যখন যাইবিই স্থির করিয়াছিস তখন তোকে আর ঠেকাইব না। তা তোর পাওনা গণ্ডা কিসের শুনি?" প্রশ্ন করে জীবনকিশোর।
যৌবনানন্দ চুপ করিয়া থাকে।
কহিয়া চলে জীবনকিশোর, "আমি যদি হই নদী, তুই আমার স্রোত। নদী না থাকিলে তো স্রোতের কোনও অস্তিত্বই নাই। জানিবি, আমাকে ছাড়িয়া তুই বাঁচিবি না। সাগরে নিঃশেষ হইবার আগে পর্যন্ত নদীকে অবলম্বন করিয়াই স্রোতকে চলিতে হয়। আমার মধ্যা দিয়াই তোর মুক্তি।"
খানিক ভাবিয়া যৌবনানন্দ অবশেষে কহিল, "তবে চলো, বিলাপ ছাড়িয়া দুইজনে মিলিয়া অস্তগামী দিবাকরের আলোয় ভর করিয়া পলাশ, কৃষ্ণচূড়ার শোভা দেখিতে, দেখিতে ভালোলাগা ও ভালবাসার ঊর্ধ্বে উঠিয়া যৌবনকে নূতন করিয়া প্রেমের আলোকে দর্শন করি।"

Sunday, March 4, 2012

পাতিলেবু, ছানা, ইত্যাদি

কি বিপদ! কি বিপদ!! কি বিপদ!!! দুগ্ধ হইতে প্রস্তুত ছানা দিয়া কি প্রকার এক খাদ্য প্রস্তুত করিবেন আমার গৃহিণী। তাহাতে দোষ নাই। তবে ভালো না লাগিলেও হাস্যমুখে কহিতে হইবে বেশ খাইতে হইয়াছে, উত্তম হইয়াছে। আবার খাইতে ইচ্ছা হয়। খুব শীঘ্রই আবার ইহা প্রস্তুত করিও। তবে সে তো অনেক পরের ব্যাপার। দুগ্ধ হইতে ছানা প্রস্তুত করিতে পাতিলেবুর রস লাগে। আমার পুত্র ঠিকমতো চিনিয়া, বাছিয়া বাজার হইতে দুইটি পাতিলেবু লইয়া আসিয়াছে। দুঃখ এই, দুইটি পাতিলেবুই হরিৎ বর্ণের, অর্থাৎ কিনা কাঁচা, এবং কঠিন অর্থাৎ শক্ত। এইবার তলব পরিলো আমার। "লেবু হইতে রস বাহির করিয়া দুগ্ধে নিক্ষেপ করিয়া যাও, ইহারা বড় কঠিন", রান্নাঘর হইতে গৃহিণীর কণ্ঠস্বর কানে আসিয়া পৌঁছাইলো। অতএব কাজ ছাড়িয়া উঠিলাম।

গরম দুগ্ধের উপর আধখানা লেবু হাতে লইয়া কচলাইতে শুরু করিলাম। মুহূর্তের মধ্যেই বুঝিলাম কেন আমার তলব পরিয়াছে। আমি কহিলাম, "আমি কি হাতি যে পদতলে সকল কিছুকে দলিয়া পিষ্ট করিতে পারিব?" গৃহিণী ঈষৎ হাসিল। এক এক করিয়া দুইটি লেবুর চারিটি ফালি হইতে প্রাণপণ শক্তিতে রস নির্গত করিয়া দুগ্ধে নিক্ষেপ করিলাম। কচলানোর সময় ভীষণ সাবধানতা অবলম্বন করিতে হইল। হাত ফসকাইয়া লেবুর খণ্ডটি দুগ্ধে পড়িয়া গেলে লেবুর বাকি খণ্ডগুলি দিয়া আমার ছানা প্রস্তুত হইত। যাহা হউক, কোনও বিড়ম্বনা ঘটিল না। ছানা প্রস্তুত হইল। আমি রান্নাঘর হইতে প্রস্থান করিলাম। এইবারের মত রক্ষা পাইলাম বটে, তবে প্রায়শই আমার ওই লেবুর খণ্ডগুলির মত দশা হয়। গৃহিণীর দ্বারা নিংড়ানো, কচলানোর হাত হইতে কে কবে বাঁচিয়াছে?

ছানা দিয়া প্রস্তুত খাদ্যটি কেমন হইয়াছিল তাহা না খাইয়া বলিতে পারিলাম না। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বিশেষ আশার সঞ্চার করে না।

ওই যে টিকটিকি নামক প্রাণীটি, উহাকে আমি ডাকিয়া আমার বাসগৃহে আনি নাই। কিন্তু হইবে কি? রান্নাঘরে টিকটিকি দেখিলেই হইল। আমার দশা হইয়া পড়ে টিকটিকির চাইতেও করুণ। "ভেবেছ কি? বলি ভেবেছ কি? আমার রান্নাঘরে টিকটিকি, আর তুমি নাকে তেল দিয়ে ঘুমবে?" এমন বাক্য প্রায়ই শুনি। টিকটিকি কি আমার পোষা? আর টিকটিকি পুষিয়া যদি সন্তুষ্ট থাকিতে পারিতাম, তবে কি আর আমার এই দশা হইত? টিকটিকি বা আরশোলা তাড়াইবার যন্ত্রটা খুব সম্ভব আমারই নাকি আবিষ্কার করা উচিত ছিল। না পারাটাই আমার ঘোর অক্ষমতা। আহা! বাদ পড়িয়া গেছে। ওই যে আটটি পা বিশিষ্ট প্রাণীটি, মাকড়শা যার চলতি নাম, যদি দেখা যায় কোথাও, তবে আর কথা নাই। একবার চিৎকার করিয়াই সব স্তব্ধ। শয়নকক্ষে বাঘ দেখিলে ঠিক যেমনটি হয়। পিটাইয়া মাকড়শা মারিবার জন্য একটি ঝ্যাঁটা রাখা আছে কিন্তু মাকড়শা প্রাণীটি বাস্তবিকই চতুর। মাকড়শার চতুরতার সঙ্গে আমি ঠিক জড়াইয়া পরি।

বাজার হইতে ফরমাসের কোনও জিনিস আনিতে ভুলিয়া গেলে চলিবে না। অধিকাংশ সময়ই পুনরায় বাজার যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও গতি থাকে না। কে যেন একসময়ে বলিয়াছিল, সব কিছুর জন্য তো আর ঈশ্বর বা সরকারকে দায়ী করা যায় না। তাই গৃহস্বামীকেই অধিকাংশ অঘটনের জন্য আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। আস্তে আস্তে গোটা জীবনটাই কাঠগড়ার চেহারা লইয়া তিন দিক হইতে ঘিরিয়া ফেলিতে থাকে। কাঠগড়ার একটি দিক অবশ্যই খোলা। তবে খোলা দিকটিতে কড়া পাহারা সর্বদাই মোতায়েন থাকে। গৃহস্বামীটির জেল হয় না কখনও। কিছুটা আনন্দ-নিরানন্দের সহিত সে চিরকাল গৃহপালিত অবস্থায় কাঠগড়াতেই দণ্ডায়মান থাকে।

Friday, February 10, 2012

ছাগলের পাকস্থলী

বটুকবাবু আমার বাড়ির বিপরীতেই থাকেন। ভদ্র, সচ্চরিত্র, মাঝবয়সী, সংসারী মানুষ। জীবজন্তু লইয়া অনেক পড়াশুনা করিয়া এক্ষণে এক জীবজন্তুর হাঁসপাতালে হিসাবরক্ষকের কাজ করেন। কিসের হিসাব রাখেন আমি অবশ্য জানি না।

এ হেন বটুকবাবু একদিন হাঁসপাতাল হইতে যখন ফিরিলেন তখন তার কোলে দেখা গেলো একটি ছাগল। সকলে ভাবিল পাঠা, কাটিয়া খাইবেন। পরে জানা গেলো ওটি একটি মেয়ে পাঠা, অর্থাৎ কিনা ছাগল। তা হউক না ছাগল, দোষের কি। ছাগল গৃহপালিত পশু, দুধ দেয়, ম্যা, ম্যা করিয়া ডাকে এবং কামড়ায় না। দুই দিন বাদে জানা গেলো ছাগলটি বটুকবাবু পুষিবার জন্য আনিয়াছেন। তা গ্রামে, গঞ্জে তো লোকে ছাগল পুষিয়াই থাকে। তবে কিনা কলিকাতার মত শহরের এক সম্ভ্রান্ত পল্লীতে গৃহে ছাগল? এ পর্যন্তও মানিয়া লওয়া গেলো।

প্রতিদিন সকালে দেখি বটুকবাবু ছাগলটির সামনের দুই পা উপরে তুলিয়া ধরিয়া তাকে পিছনের দুই পায়ে হাঁটানোর চেষ্টা করিতেছেন। একদিন আমাকে রাস্তায় ধরিয়া ছাগলের পাকস্থলীর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা শুনাইলেন বটুকবাবু। পাকস্থলীর ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে নাকি দুই পায়ে হাঁটিবার বিশেষ সম্বন্ধ রহিয়াছে। শুনিলাম, বুঝিলাম না কিছুই। হয়ত ভালো করিয়া শুনি নাই। ছাগলের পাকস্থলীর খবরে আমার কি কাজ তাহাও বুঝিলাম না।

যাহা হউক, একদিন এক কাণ্ড ঘটিলো। বটুকবাবুর স্ত্রী একটি উঁচু জায়গায় ডালের বড়ি রোদ্দুরে রাখিয়াছিলেন, শুকাইবার জন্য। ছাগলটি কাছেই বাঁধা ছিল। কিছুক্ষণ বাদে আসিয়া দেখেন ছাগলটি সামনের দুইটি পা উঁচু জায়গাটিতে তুলিয়া আপন মনে সেই কাঁচা ডালের বড়ি চিবাইতেছে। পাশেই ঝুলিতেছিল বটুকবাবুর স্ত্রীর একখানি শাড়ি, শুকাইতে দেওয়া। ছাগলটি তারও কিয়দংশ খাইয়া ফেলিয়াছে। দেখিয়া বটুকবাবুর স্ত্রী তো রাগিয়া আগুন।

তিনি বলিলেন, "এ কি করেছিস?"
ছাগলটি দাঁড়ানো অবস্থাতেই ডাকিয়া উঠিল, "ম্যা।"
বটুকবাবুর স্ত্রী বলিলেন, "কে তো মা? দাঁড়া, আজ তোর বাবা আসুক। এ বাড়িতে হয় তুই থাকবি, নয় আমি থাকব।"
ছাগলটি আবার ডাকিল, "ম্যা।"
বটুকবাবুর স্ত্রী মুখ ঘুরাইয়া ঘরে ঢুকিয়া গেলেন। এই বিস্তারিত বিবরণ আমি আমার স্ত্রীর নিকট হইতে শুনি। বিবরণে কিছু বাদ পরিয়াছিল কিনা কহিতে পারি না। তবে যা শুনিলাম, তাহাই যথেষ্ট। বটুকবাবু গৃহে ফিরিবার পর যা ঘটিলো তাহা সহজেই অনুমেয়। ছাগলটিকে আর পরদিন হইতে দেখিতে পাই নাই।

তবে বটুকবাবু, তার স্ত্রী ও ছাগলটি, এই তিনজনের মধ্যে বুদ্ধির প্রতিযোগিতায় ফলটি যা দাঁড়াইল, মানুষ হইয়া তাহা আমি কোনোমতেই মানিয়া লইতে পারিলাম না।

Monday, February 6, 2012

একটি ভুতের জবানবন্দী

কি আর বলব আপনাকে? ভুত সমাজে আর মান সম্মান থাকবে না আমাদের। মানুষগুলো কি ভয়ানক বেড়ে উঠেছে তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। আমরা ভুত, ভয় দেখানো আমাদের বহু প্রাচীন পেশা। প্রাগৈতিহাসিক যুগেও ভুত ছিল। আজও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। আমাদের সমাজে ভয় দেখানোর ক্ষমতাটা সামাজিক প্রতিষ্ঠা পাওয়ার ছারপত্র। আমাদের বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি করতে গেলে আগেই দেখে বাচ্চার বাবা এযাবৎ কয়টা ভুতুড়ে বাড়িতে থেকে কতজন মানুষকে ভয় দেখিয়েছে। কি ভাবছেন? সব হিসেব রাখতে হয় আমাদের। আপনাদের মত আমাদের বায়েও-ডেটা হয় না। ওটা খুব সেকেলে পদ্ধতি। তা ছাড়া কাগজ পত্তরের ব্যবহার আমাদের উঠে গেছে পাঁচ হাজার বছর আগে। আমাদের ভয় দেখানোর হিসেব আপনা-আপনি নিকটবর্তী নীম অথবা শ্যাওড়া গাছের কোটরে জমা পরতে থাকে। নীম, শ্যাওড়ার সঙ্গে আমাদের বহুকাল ধরে লেন দেন হয়ে আসছে কিনা। আমরা ওই গাছ দুটোকে খুব বিশ্বাস করি। এইতো দেখুন, কেলে পেত্নী গত বছর তার ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করতে পারলো না। কারণ এক বাড়িতে গিয়ে ভয় দেখানো তো দূরের কথা, সে ভয় দেখাতে গিয়ে নিজেই অজ্ঞান হয়ে পরেছিল। মানুষগুলো অবিশ্যি বুঝতে পারেনি। তাই রক্ষা। আমরা সঙ্গে যারা ছিলাম, তারা গোবর জলের ছিটে দিয়ে তাঁর জ্ঞান ফেরাই। এখন বছর পাঁচেক সে কোনও ভয় দেখানোর কাজই পাবে না। ছেলেটাও তাঁর মুক্ষু হয়ে থাকবে। তবেই বুঝতে পারছেন কেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এটা।

যাই হোক, মানুষের ঔদ্ধত্য বেড়ে ওঠার কথা বলছিলাম। আমার ঠাকুরদা ছিলেন ওই আমাদের প্রাথমিক স্কুলের খুব জাঁদরেল মাস্টারমশাই। তিনি যে সব ভয় দেখানোর পদ্ধতি শেখাতেন, তা কোনোদিন বিফলে যেত না। নিচু ক্লাস থেকেই বাচ্চারা খুব ওস্তাদ হয়ে উঠত। বছর পঞ্চাশেক আগেও আমরা একটু খাট, বিছানা নাড়া দিলে মানুষগুলো ভয়ে কাঁপতো। গুঙিয়ে মরা কান্না জুড়লে তো আর কথাই নেই। প্রায় অক্কা। স্কন্ধকাটা হয়ে মানুষের সামনে চলাফেরা করা আজকাল আর হয় না। ওতে মানুষের অক্কা পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ভুল করবেন না, ভুতেদের মধ্যেও কতগুলি নীতিবোধ আছে। সেই মানুষগুলো আজকাল বলে কিনা ভুত বলে কিছু নেই। মানুষের বাচ্চাগুলো আমাদের দেখে ভেঙচি কাটে। কি লজ্জা, কি লজ্জা।

বলে রাখি, আমার বয়স আড়াইশোর কাছাকাছি। মরেছিলাম বিষ খেয়ে। খুব কড়া বিষ ছিল। অপঘাতে মৃত্যু কিনা, তাই ভুত হয়েছি। মানুষের ভাষায় আমি হলাম মামদো। কি বিচ্ছিরি নাম বলুন তো। আসলে আমাদের কোনও নাম হয়ে না। আমাদের নির্দেশিকা সংখ্যা হয়। আমার সংখ্যা ৩৫০২০০ । প্রথম দুটো নম্বর হোলো আমি এযাবৎ কয়টি বাড়িকে ভুতুড়ে করে রেখেছিলাম। পরের দুটো সংখ্যা হোলো ভয় দেখানোর কাজ শেষ করতে আমার কত মিনিট লাগে। আর শেষ দুটো সংখ্যা হোলো আমি কয়বার বিফল হয়েছি। বুঝতেই পারছেন, একবারও নয়। এখানে আমাকে সবাই ওই নম্বরেই চেনে। আমি কাজ করি মশানতলার ঘাটে। রাত নটা থেকে রাত তিনটে পর্যন্ত থাকতে হয় ওই ঘাটে। এক রাতে বাড়তি দু ঘণ্টা কাজ করলে দু দিন ছুটি পাই। দু বছর বাদে আমি হেড-অফিসে বদলি হয়ে যাবো। জঙ্গলের শেষ প্রান্তে দেখবেন তিনটে নীমগাছ এক জায়গায় আছে। ওটাই আমাদের হেড-অফিস। তখন নীমের ডালে বসে দিব্যি ঠ্যাং নাড়াতে পারবো।

একটা কথা বলে রাখি। এসব কথা খবরের কাগজের লোকেদের দয়া করে জানাবেন না। আমরা প্রচার একদম পছন্দ করি না।

তাই বলছিলাম, মানুষগুলো আমাদের কি বিচ্ছিরি সব নাম দিয়েছে। আমাদের মধ্যে বিধবা মেয়ে-ভুত যারা, তাদের অবশ্য করে মাছ খেতে হয়। এটাই আমাদের নিয়ম। মানুষগুলো তাদের বলে কিনা মেছো-পেত্নী। হতভাগা, মাছ কি তারা সখ করে খায়? নইলে জানবেন আমরা মাছ, মাংস একদমই খাই না। যে সব মেয়েমানুষ বিয়ে হওয়ার আগেই অক্কা পায়, তারা এখানে এসে বিয়ে করতে চায় না। আমরা কোনও জোর জবরদস্তিও করি না। তারা মানানসই মানুষের খোঁজ পেলে তার ঘার মটকে, এখানে এনে, অমাবস্যার রাতে গায়ে গোবরের পর কচু-দেবতার সামনে তার সঙ্গে ঘেঁটুফুলের মালা বদল করে বিয়ে করে। মানুষেরা তাদের নাম দিয়েছে শাঁকচুন্নি। ঘর-গেরস্থালী করা বধূর এমন কুচ্ছিত নাম দেওয়া উচিত? আর ওই আপনারা কি কি যেন বলেন? ঝ্যাঁটায়-চড়া ডাইনী, উল্টো-পা পেত্নী, আরও কত কি। আমাদের রাজ্যে কেউ ঝ্যাঁটায় চড়ে উড়ে বেড়ায় না। ঝ্যাঁটা ব্যবহার হয় একমাত্র বিয়ের সময়। আর পেত্নীদের পা কখনও উল্টো হয় না। পা উল্টো হলে দুই নারকোল গাছের মাথায় দুই পা রেখে দাঁড়াতে অসুবিধা হতো না?

কচু-দেবতার কথা একটু বলে রাখি। বিরক্ত হচ্ছেন না তো? আমরাও পূজা করি। পুরাতন মানকচুর গায়ে চামচিকের রক্ত দিয়ে তিলক কেটে তৈরি হয় আমাদের বিগ্রহ। কচি বিছুটি পাতার মালা পরিয়ে আমরা তাতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করি। আপনাদের তুলসী, আমাদের হোলো বিছুটি। যেদিন গোরস্থানের মাঠে ওই নতুন বিগ্রহ বসানো হয়, সেদিন আমরা সবাই দেহ ধারণ করি। ওই একদিনই আমাদের জামাকাপড় পরতে হয়। একবার একটা মানুষ আমাদের ওই কচু-দেবতার গায়ে পা দিয়েছিল। মরে গেলো পরের দিনই। আত্মহত্যা করলো। আত্মহত্যা করে যারা আমাদের এখানে আসে তাদের কোনও এক কচি মেছো-পেত্নীকে বিবাহ করতে হয়। আমরা অবশ্য আত্মহত্যা করি না। আমাদের হয় আত্ম-জাগরণ। প্রতি পঞ্চাশ বছর পর আমরা কচু-দেবতার সামনে জ্যান্ত চামচিকে বলি দিয়ে আমাদের দীর্ঘ আয়ু কামনা করি।

অমাবস্যার বিভীষিকা আমাদের এই সমাজের সবচেয়ে বিজ্ঞ ও পণ্ডিত ভুত। বয়স দু হাজার পেরিয়ে গেছে। এখন সে অবসরপ্রাপ্ত। সে নাকি একবার নেপোলিয়নের তাবুতে ঢুকে তার লুঙ্গির খুঁট ধরে টেনেছিল। পরদিন নেপোলিয়ন ভয়ে যুদ্ধে যান নি। হাঁ, ভয় দেখাতেও সাহস লাগে। নেপোলিয়নের তাবুতে ঢোকা কি যে সে কথা? সে বলছে ভুতেদের খুব দুর্দিন আসছে। কারণ মানুষেরা নাকি অন্য গ্রহে বসবাসের ব্যবস্থা প্রায় পাকা করতে চলেছে। মানুষ না থাকলে কি আর ভুতেদের দিন চলবে?

Tuesday, January 17, 2012

ব্যাঙ, ঝি ঝি পোকা, ইঁদুর, প্যাঁচা ও প্রেম

চাঁদের আলো পরেছে তোমার এলো চুলে ভারি সুন্দর যে শব্দটা শুনতে পাচ্ছ ওটা ব্যাঙের ডাক থেমে যাবে কিছুক্ষণ বাদে ওতে প্রেমের কোনও ব্যাঘাত ঘটে না ওটাও প্রেমেরই ডাক দূরে মাঠের প্রান্তে আন্ধকারটা বড্ড বেশী সুধু একটা তালগাছ মাথা তুলে দাড়িয়ে আছে আকাশের প্রেক্ষাপটে তালগাছটা বড্ড একা তাই নয় কি? প্রেমের গান তুমি গাইতে পারো না তা আমি অনেকদিন আগেই জেনেছি তাতে কিছু আসে যায় না তুমি নীরব থেকেই অনেক কিছু বলে ফেলো আমিও শুনি নীরবে দেখো, এই নীরবতা যেন কোনদিন ভঙ্গ না হয় ঝি ঝি পোকার ডাকটা আর শুনতে পাচ্ছি না বোধহয় ব্যাঙটা ওকে খেয়ে ফেলেছে ব্যাঙ ঝি ঝি পোকা খায় কি? জানি না তবে দুর্ভিক্ষের সময় নিশ্চয় খায় ব্যাঙ আর ঝি ঝি পোকা, কোনোটাই দিনে ডাকে না আমি তো শুনিনি এরই সঙ্গে মনে পরলো প্যাঁচার কথা ওরাও বিচরণ করে সুধুমাত্র রাতের বেলায় ইঁদুর ধরতে প্রেম জমাতে এদের কোনও জুরি নেই

চাঁদটা চলে গেলো মেঘের আড়ালে গাঢ় হলো অন্ধকার এই অন্ধকারে তোমার অস্তিত্ব অনুভব করে নিজেকে বেশ মস্ত কেউ একটা মনে হচ্ছে দিনের আলোয় এমনটা কখনও হয় না দিনটা কেজো লোকেদের জন্য আর রাতটা যত বাউন্ডুলে অকাজের লোকেদের বিচরণ ক্ষেত্র যখন আর কোনও কিছু ভালো লাগে না তখন তোমার সান্নিধ্যই পেতে ইচ্ছা হয় তাতে নতুন করে ভালোলাগার জন্ম হয় চাঁদেরও ঠিক এমনটাই হয় ওরও মেঘের সাথে যত লুকোচুরি খেলা যা বললাম এতক্ষণ, বাস্তবের সাথে বোধহয় এর কোনও মিল নেই সুধুমাত্র প্যাঁচার ইঁদুর ধরা ছাড়া বেচারা ইঁদুর রাতের অন্ধকারেও রেহাই নেই একবার এক ইদুর তাই ছন্দ মিলিয়ে দু চার পঙক্তি লিখেছিল

"দিনে কাক, রাতে প্যাঁচা,
সাঙ্গ হবে আমার বাঁচা,
মানুষ তার সঙ্গে জুটে
দেখলেই মারে লাঠির খোঁচা"

কে যেন কবে একটা নাটক লিখেছিলেন নাম দিয়েছিলেন 'মরবে ইঁদুর বেচারা' নাটকটা পড়ে দেখিনি কখনও তবে ইঁদুরের দুর্গতির কথা বেশ অনুমান করতে পারছি যাই হোক, এ প্রবন্ধের যবনিকা পাত এখানেই হওয়া উচিত নয়ত পাঠক পাঠিকাদের হাতে খুব শীঘ্রই আমারও ইঁদুরের দশা হবে
Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...